মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি : কম খরচে বেশি উৎপাদন
মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও
লাভজনক মৎস্য চাষ প্রযুক্তি হিসেবে পরিচিত। দ্রুত বৃদ্ধি, কম সময়ে উৎপাদন এবং
তুলনামূলক সহজ ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক চাষি এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন।
সঠিক পুকুর প্রস্তুতি, উন্নত মানের পোনা নির্বাচন, সুষম খাদ্য ও নিয়মিত
পরিচর্যার মাধ্যমে তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতিতে ভালো ফলন অর্জন করা সম্ভব। এই
আর্টিকেলে মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের বিভিন্ন ধাপ ও সফল হওয়ার কার্যকর কিছু উপায়
সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
পেইজ সূচিপত্রঃ মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি
- মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি কি এবং কেন জনপ্রিয়
- মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের পুকুর নির্বাচন
- মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষে পুকুর প্রস্তুতি বা মজুদ পূর্ব ব্যবস্থাপনা
- মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষে পুকুর মজুদকালীন ব্যবস্থাপনা
- মজুদ পরবর্তী খাদ্য ব্যবস্থাপনা
- তেলাপিয়া মাছের স্বাস্থ্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
- মনোসেক্স তেলাপিয়া আহরণ ও উৎপাদন
- মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতিতে আয়-ব্যয়ের হিসাব
- মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ পদ্ধতিতে সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
- লেখকের নিজস্ব মতামত: মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি
মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি কি এবং কেন জনপ্রিয়
মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ এমন একটি পদ্ধতি যেখানে শুধুমাত্র একক সেক্স বা
পুরুষ তেলাপিয়া মাছের চাষ করা হয়। এতে করে তেলাপিয়া মাছ প্রজনন করতে পারে
না এবং বংশবিস্তার করে পুকুর ভরে ফেলতে পারে না অর্থাৎ মাছের পরিমাণ ও সংখ্যা
নিয়ন্ত্রণে রেখে সঠিক পরিচর্যা করা সম্ভব হয়। এই পদ্ধতিতে মাছ দ্রুত
বৃদ্ধি পায় এবং পুকুরে অনিয়ন্ত্রিত প্রজনন কম হওয়ায় উৎপাদন আরও বেশি হয়।
সাধারণ তেলাপিয়া চাষের তুলনায় এখানে খাবারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাজারজাত উপযোগী মাছ পাওয়া যায়। সঠিক পুকুর প্রস্তুতি,
উন্নত মানের পোনা নির্বাচন এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এই চাষ থেকে ভালো ফলন
অর্জন করা সম্ভব।
মিশ্র তেলাপিয়া চাষ করলে নিজেদের মধ্যে প্রজনন ঘটিয়ে খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে,
যার ফলে পুকুরে মাছের সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং কোনো মাছই সঠিকভাবে বাড়তে
পারে না। এই সমস্যার শতভাগ সমাধান হলো হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদিত শুধু
পুরুষ তেলাপিয়া বা মনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা। পুরুষ তেলাপিয়ার শারীরিক বৃদ্ধির
হার স্ত্রী তেলাপিয়ার চেয়ে প্রায় ৩০% থেকে ৪০% বেশি হয়। এরা পুকুরে
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না বলে সব মাছ সমানভাবে এবং দ্রুত বড় হয়ে
ওঠে।
আরও পড়ুনঃ সুনীল অর্থনীতি ও বাংলাদেশ
বর্তমানে এই চাষ পদ্ধতি জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো কম সময়ে বেশি উৎপাদন ও
বেশি লাভের সুযোগ। তেলাপিয়া মাছ তুলনামূলকভাবে রোগ সহনশীল এবং বিভিন্ন পরিবেশের
সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ফলে নতুন ও অভিজ্ঞ উভয় ধরনের চাষির কাছেই এটি
একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে পরিচিত হয়েছে। দেশে মাছের চাহিদা পূরণ,
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং কৃষিভিত্তিক আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও মনোসেক্স তেলাপিয়া
চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের পুকুর নির্বাচন
মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের জন্য পুকুর নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে
পুকুর নির্বাচন করা হলে আশানুরুপ ফলাফল পাওয়া যাবে। দূষণমুক্ত ও পরিবেশের
জন্য হুমকি নয়, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত পানি এবং সূর্যের
আলো পড়ে এমন স্থানে পুকুর নির্বাচন করতে হবে। মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের জন্য
পুকুর নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়গুলো নিচে দেয়া হলো--
- আয়াতাকার পুকুর মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের জন্য ভাল
- নার্সারী পুকুরের আয়তন ১৫ শতক এবং চাষের পুকুরের আয়তন ২০ শতক থেকে ১০০ শতক হলে ভাল
- পুকুরের পাড় ঝোপঝাড় ও বড় ডালপালাযুক্ত গাছ মুক্ত হবে
- পুকুরের পাড় উচুঁ ও বন্যামুক্ত হবে
- পুকুরে দিনে ৬-৮ ঘন্টা সূর্যের আলো পড়বে
- পুকুরের তলায় কাদার পরিমান ৪-৬ ইঞ্চির হওয়া বাঞ্চনীয়
- পুকুরের তলা সমান হবে
- সারা বছর অথবা ৪-৬ মাস পুকুরে পানি থাকবে
- পানির pH ৭-৭.৫ হবে
- পানির গভীরতা ৬-৭ ফুট হবে
- পুকুরের মাটি দোঁ-আশ হলে ভাল
মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষে পুকুর প্রস্তুতি বা মজুদ পূর্ব ব্যবস্থাপনা
মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষে পুকুর প্রস্তুতি বা মজুদ পূর্ব ব্যবস্থাপনাকে কয়েকটি
ভাগে ভাগ করা যায় নিম্নে ভাগ গুলো পর্যায়ক্রমে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
যেগুলো ফলো করলে আপনি তেলাপিয়া মাছ চাষে শতভাগ ফলাফল আশা করতে পারেন।
ক. পুকুর সংস্কার, পুকুরের পাড় ও তলা মেরামত
পুকুরের পানির গুনগতমান ভাল রাখতে, মাছ চাষকালীন রোগ ও অন্যান্য ঝুঁকি হ্রাস
করতে, মাছের বৃদ্ধি এবং গুনগতমান ভাল রাখার জন্য পুকুরে পোনা মজুতের
পূর্বে পুকুর সংস্কার, পুকুরের পাড় ও তলা মেরামত করা প্রয়োজন।
শীতের শেষে পুকুর প্রস্তুতের সময় পুকুরের পাড় ভালভাবে মেরামত করে নিতে হবে।
ভালভাবে পাড় মেরামত করা হলে বৃষ্টি বা বন্যার সময় দূষিত পানি এবং
রাক্ষুসী ও অবাঞ্চিত মাছ পুকুরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং চাষকৃত মাছ পুকুর হতে
বের হয়ে যাবে না।
পুকুরের তলায় অতিরিক্ত কাদা থাকলে পুকুরে ক্ষতিকর গ্যাস সৃষ্টি, অক্সিজেন ঘাটতি
এবং পুকুরে জাল টানতে অসুবিধা হয়। তাই পুকুরের তলার ৪-৬ ইঞ্চির বেশি
কাদা থাকলে তা অপসারন করতে হবে। পুকুরের তলদেশে গর্ত বা উচুঁ নিচুঁ থাকলে সমান
করে দিতে হবে। পুকুরের পাড়ে বড় ডালপালার গাছ ও ঝোপঝাঁড় থাকলে তা কেটে ফেলতে
হবে। এতে করে পুকুরে পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলো পড়বে যা পুকুরে প্রাকৃতিক
খাদ্য উৎপাদনে সহায়ক হবে এবং ঝোপঝাঁড়ে মাছ খেকো প্রাণি লুকিয়ে থাকতে পারবে
না।
খ. জলজ আগাছা নিয়ন্ত্রণ
পুকুরে জলজ আগাছা থাকলে কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে তুলে ফেলতে হবে কারণ পুকুরে
জলজ আগাছা থাকলে পুকুরের পানির পুষ্টি উপাদান শোষন করে, সূর্যের আলো প্রবেশে
বাধা সৃষ্টি করে এবং আগাছা পঁচে পানির গুনাগুন নষ্ট করে ফলে পুকুরের
উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং পুকুরে গ্যাসের সৃষ্টি হয় ও রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি বেড়ে
যায়।
পুকুরে জলজ আগাছা সাধারণত ০৩ ধরণের হয় যথা- ভাসমান, লতানো ও
নিমজ্জিত। কায়িক শ্রমের মাধ্যমে পুকুরের যাবতীয় আগাছাকে দা বা কাঁচি দিয়ে
কেটে অথবা দড়ি টেনে আগাছার শিকড়সহ তুলে ফেলতে হবে। এছাড়া গ্রাস কার্প,
মিরর কার্প ও কার্পিও মাছ ছেড়ে জৈবিক পদ্ধতিতেও জলজ আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা
যায়।
গ. রাক্ষুসী ও অবাঞ্চিত মাছ নিয়ন্ত্রণ
লাভজনক মাছ চাষের ক্ষেত্রে রাক্ষুসী ও অবাঞ্চিত মাছ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ
রাক্ষুসী ও অবাঞ্চিত মাছ খাদ্য ও বাসস্থান নিয়ে চাষকৃত মাছের সাথে প্রতিযোগিতা
করে চাষকৃত মাছের উৎপাদনকে ব্যাহত করে, ফলে ভাল ব্যবস্থাপনা সত্ত্বেও সন্তোষজনক
উৎপাদন পাওয়া যাবে না। সাধারণত রাক্ষুসে মাছ চাষকৃত মাছকে খেয়ে ফেলে। যেমন-
যেমন- শোল, বোয়াল, চিতল, ফলি, কাকিলা, বাইল্যা, টাকি মাগুর ইত্যাদি মাছ
রাক্ষুসী স্বভাবের। অন্যদিকে অবাঞ্চিত মাছ চাষকৃত মাছের সাথে খাদ্য,
বাসস্থান এবং অক্সিজেন নিয়ে প্রতিযোগিতা করে। যেমন- মলা, ঢেলা, পুটি, চান্দা,
ইচা (ছোট চিংড়ি) বইচা ইত্যাদি।
পুকুর শুকিয়ে এবং বিষ প্রয়োগ করে রাক্ষুসে ও অবাঞ্চিত নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
রাক্ষুসে ও অবাঞ্চিত মাছ নিয়ন্ত্রণ করা জন্য পুকুর শুকানো সবচেয়ে ভাল তবে পুকুর
শুকানো সম্ভব না হলে ঔষধ প্রয়োগ করে রাক্ষুসে ও অবাঞ্চিত মাছ দূর করা যায়।
এজন্য রোটেনন, চা বীজের খৈল বা তামাকের গুড়া ব্যবহার করা যেতে পারে। এ
গুলোর কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। যেমন রোটেনন, চা বীজের খৈল ও তামাকের গুড়া জৈব উৎস
হতে উৎপন্ন হওয়ায় এসব ঔষধ জৈব সার হিসেবে কাজ করে। এসব ঔষধ মাছের ফুলকায় আক্রমণ
করে ফিলামেন্ট বন্ধ করে দেয়, ফলে মাছ দম বন্ধ হয়ে মাছ মারা যায়। এভাবে মারা মাছ
খাওয়া যায়। এছাড়া ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করেও রাক্ষুসে ও অবাঞ্চিত নিয়ন্ত্রণ
করা হয়।
বাজারে সাধারণত দু'ধরনের শক্তির রোটেনন পাওয়া যায়। যেমন: ৯.১% এবং ৭% শক্তি
সম্পন্ন রোটেনন। রোটেননের শক্তির উপর এর প্রয়োগ মাত্রা নির্ভর করে। কড়া রোদ
থাকলে রোটেননের পরিমাণ কিছুটা কম লাগে আবার তুলনামূলক ঠান্ডা পানিতে রোটেননের
পরিমাণ বেশি লাগে। প্রতি শতাংশে ১ ফুট পানির গভীরতার জন্য ৯.১% বা
৭% মাত্রার রোটেনন যথাক্রমে ১৮-২০ গ্রাম বা ২৫-৩০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করা
হয়।
ব্যবহার পদ্ধতি
প্রয়োজনীয় পরিমাণ রোটেনন পাউডার গামলা বা বালতিতে নিয়ে পানি
মিশিয়ে প্রথমে 'কাই' তৈরি করতে হবে। এরপর এই কাঁই তিনভাগে ভাগ করে, এক ভাগ
দ্বারা ছোট ছোট বল বানাতে হবে এবং বাকী দু'ভাগ প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি মিশিয়ে
তরণ করতে হবে। ছোট বলগুলো প্রথমে সমস্ত পুকুরের পানিতে সমান ভাবে ছিটিয়ে দিতে
হবে । এরপর রোটেননের তরল মিশ্রণ পুকুরের পানিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। পানিতে আলোড়ন
সৃষ্টি করতে হবে। এরপর ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে মাছ ভেসে উঠলে জাল টেনে মাছ ধরতে
হবে। রোটেননের বিষাক্ততার মেয়াদকাল প্রায় ৭দিন।
ব্লিচিং পাউডার
প্রতি শতাংশে ১ ফুট পানির গভীরতার জন্য ৬৫% ক্লোরিনযুক্ত
ব্লিচিং পাউডার ৩০০ গ্রাম অথবা ৩০% ক্লোরিনযুক্ত ব্লিচিং পাউডার ৭৫০ গ্রাম হারে
পানির সাথে মিশিয়ে সন্ধ্যা বা রাতে ছিটিয়ে দিতে হবে।
চা বীজের খৈল
রাক্ষুসী ও অবাঞ্চিত মাছের পাশাপাশি পুকুরে যদি কুচিয়া, কাঁকড়া,
সাপ ও শামুক থাকে সেক্ষেত্রে চা বীজের খৈল ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতি
শতাংশে ১ ফুট পানির গভীরতার জন্য ২৫০-৩০০ গ্রাম চা বীজের খৈল পানির সাথে ৬-৮
ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে রৌদ্রাউজ্জল দিনে ছিটিয়ে দিতে হবে।
ঘ. মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের পুকুরে চুন প্রয়োগ
চুন ক্যালসিাম সমৃদ্ধ অজৈব যৌগ যা পুকুরের মাটি ও পানির অবস্থা ভাল রাখে। মাছ
চাষের পুকুরে মাটি ও পানির pH মাছ চাষের উপযোগী রাখতে, সারের কার্যকারীতা
বৃদ্ধি, পরজীবী ও রোগজীবাণু দূর করতে, পুকুরের তলায় জৈব পদার্থের পচন প্রক্রিয়া
তরান্বিত করতে, কাঁদায় আবদ্ধ ফসফরাস মুক্ত করতে, পানির ঘোলাত্ব দূর করতে এবং
মাছের বৃদ্ধি তরান্বিত ও হাড় গঠনের জন্য চুন প্রয়োগ করা হয়।
আমাদের দেশের বাজারে বিভিন্ন ধরণের চুন পাওয়া যায়। যেমন- পাথুরে চুন, পোড়া চুন,
কলি চুন, ডলোমাইট এবং জীপসাম। চুন প্রয়োগের সঠিক মাত্রা নির্ভর করে মাটি ও
পানির pH মাত্রার উপর । সাধারণভাবে প্রতি শতকে ১-২ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করা
হয়ে থাকে। শুকনা পুকুরে পুকুর প্রস্তুতকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ চুন গুড়া
করে পুকুরের পাড়সহ সমস্ত জায়গায় সমানভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। অন্যদিকে পানি ভর্তি
পুকুরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ চুন মাটির চাড়ি বা ড্রামে গুলে পাড়সহ সমস্ত পুকুরে
সমানভাবে ছিটিয়ে নিতে হবে।
শুকনা পুকুরে চাষ দেয়ার ১-২ দিন পর এবং পানি ভর্তি পুকুরে বিষ প্রয়োগের ৭ দিন
পর অথবা সার প্রয়োগের ৭ দিন আগে চুন প্রয়োগ করতে হবে। রৌদ্রজ্জল দিনে
সকালে অথবা বিকেলে চুন প্রয়োগ করতে হবে তবে মাছ ভর্তি পুকুরে আবহাওয়া খুব বেশি
গরম থাকলে চুন প্রয়োগ করা যাবে না। এতে পানির তাপমাত্রা আরও বেড়ে গিয়ে মাছ মারা
যেতে পারে। চুন গুলানো ও ছিটানোর সময় অবশ্যই নাক ও মুখ গামছা দিয়ে বাঁধতে হবে
অথবা মাস্ক পরতে হবে। চুন সর্বদায় বাতাসের অনুকূলে চুন ছিটাতে হবে।
ঙ. মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের পুকুরে সার প্রয়োগ
পুকুরে মাছের প্রধান প্রাকৃতিক খাদ্য হলো প্লাঙ্কটন। প্লাঙ্কটন দুই ধরণে হয়
যথা-ফাইটেপ্লাঙ্কটন (উদ্ভিদকণা) ও জুপ্লাঙ্কটন (প্রানিকণা)। এই প্লাঙ্কটন
উৎপাদনের জন্য জৈব ও অজৈব দুই ধরনের সার প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের মাধ্যমে
পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন হয় এতে করে মাছের সম্পূরক খাদ্যের উপর
নির্ভরশীলতা কমে ফলে মাছচাষের উৎপাদন খরচ কম হয়। প্রস্তুতকালীন সময়ে সারের
মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি নিচে দেয়া হলো-
| সারের প্রকার | উপকরণের নাম | প্রয়োগমাত্রা/ প্রতি শতাংশে | প্রয়োগ পদ্ধতি |
|---|---|---|---|
| জৈব সার | সরিষার খৈল অথবা কম্পোস্ট | ১৫০ হতে ২০০ গ্রাম অথবা ৫ হতে ৬ কেজি | টিএসপি ও সরিষার খৈল প্রায় ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে তারপর ইউরিয়ার সাথে একত্রে পানিতে মিশিয়ে পাতলা করে সমস্ত পুকুরে ছিটাতে হবে। |
| অজৈব সার | ইউরিয়া ও টিএসপি | ১০০ হতে ১৫০ গ্রাম করে মোট ২০০ হতে ৩০০ গ্রাম | কম্পোস্ট সার ইউরিয়া ও টিএসপি সারের সাথে মিশিয়ে পানিতে গুলে পুকুরে প্রয়োগ করা যেতে পারে। |
পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য কি পরিমাণে আছে তা পর্যবেক্ষণ করে সার প্রয়োগের মাত্রা
নির্ধারণ করতে হবে। পুকুরে চুন প্রয়োগের ৭ দিন পর সার প্রয়োগ করতে হবে। মেঘলা
দিনে বা বৃষ্টির মধ্যে পুকুরে সার প্রয়োগ করা যাবে না। এছাড়া পুকুরে প্রাকৃতিক
খাদ্য বৃদ্ধির জন্য প্রিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ২০০ গ্রাম
চিটা গুড়, ২০০ গ্রাম অটো/রাইস পালিশ, ১ চা চামচ ইস্ট এবং প্রিবায়োটিক ২
গ্রাম নিয়ে পরিমাণ মতো পানিতে মিশিয়ে ৪৮-৭২ ঘন্টা রাখতে হবে। এরপর এই
মিশ্রণ ছেঁকে নিয়ে প্রাপ্ত পানি সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে এবং অবশিষ্টাংশ
পুনরায় পানিতে ভিজেয়ে রাখতে হবে এবং একই ভাবে ৩-৪ বার ব্যবহার করতে হবে। এই
মিশ্রণ থেকে উৎপন্ন অনুজীব মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য প্রাণিকণা ও উদ্ভিদ কণার
খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। ফলে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং
সম্পূরক খাদ্যের উপর নির্ভরশীলতা কমে।
চ. প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা
সার প্রয়োগের ৫-৭ দিন পরে পুকুরের পানির রং সবুজ বা বাদামী সবুজ হলো বুঝতে হবে
পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপদান হয়েছে। পোনা মজুদের উপযুক্ত পরিমাণ খাদ্য
উৎপাদন হয়েছে কি না তার জন্য পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা করতে হবে।
সাধারণত খালি চোখে দেখে, হাতের তালুর সাহায্যে, সেকি ডিস্ক ব্যবহার করে অথবা
কাঁচের গ্লাসের মাধ্যমে পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা করা যায়। ভাল আবহাওয়ায়
সকাল ১০-১১ টার মধ্যে পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা করতে হবে।
পানির রং সবুজ, বাদামী সবুজ বা লালচে সবুজ হলে বুঝতে হবে পানিতে পর্যাপ্ত
প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরী হয়েছে।
অথবা হাতের তালু কনুই পর্যন্ত পুকুরের পানিতে ডুবানোর পর উপর থেকে যদি
হাতের তালু দেখা না যায় তাহলে বুঝতে হবে পুকুরে পর্যাপ্ত পরিমান খাদ্য আছে।
অথবা পরিষ্কার কাঁচের গ্লাসে পুকুরের পানি নিয়ে সূর্যের আলোতে ধরতে হবে, যদি
গ্লাসের মধ্যে ক্ষুদ্র প্রাণিকণা (গ্লাস প্রতি ৮-১০টি) দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে
পুকুরে পরিমিত প্রাকৃতিক খাদ্য আছে অথবা
সেকি ডিস্কের লাল সুতা পর্যন্ত পানিতে ডুবানোর পর যদি সেকি ডিস্ক দেখা না যায়,
তবে বুঝতে হবে পানিতে বেশী খাদ্য আছে, এসময় সার প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
ছ. পানির বিষাক্ততা যাচাই
পুকুরের পানি বিষাক্ত কি না তা যাচাই করার জন্য পোনা মজুতের ১-২ দিন আগে হাপাতে
২০-২৫টি পোনা ছেড়ে ৪-৬ ঘন্টা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি পোনাগুলোর দেহের
উজ্জ্বলতা ও চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং ৮০% পোনা বেচেঁ থাকে তবে বোঝা যাবে
পানিতে বিষক্রিয়া নেই। এই অবস্থায় পোনা মজুদ করা যাবে।
মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতিতে পুকুর মজুদকালীন ব্যবস্থাপনা
ক. সুস্থ্য-সবল পোনা মজুদ
ভাল ফলন পেতে হলে সুস্থ্য-সবল পোনা মজুদ করতে হবে। পুকুরে সুস্থ্য-সবল পোনা
মজুদ করা হলে পোনার মৃত্যুহার কম হয়, রোগবালাই কম হয় এবং বৃদ্ধি হার
বেশী হয় । সুস্থ্য-সবল পোনার বৈশিষ্ট্য হলো-
- শরীরে ক্ষত বা দাগ থাকবে না
- পোনার রং উজ্জল ও আঁইশ সুগঠিত হবে
- লেজ ও পাখনা ভাঙ্গা থাকবে না
- শরীর স্বাভাবিক পিচ্ছিল হবে
- চোখ উজ্জল, স্বাভাবিক থাকবে
- স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটবে
খ. মজুদ ঘনত্ব নির্ণয়
মজুদ পুকুরের ধরণ, চাষ পদ্ধতি, পানি পরিবর্তনের সুযোগ, অক্সিজেন সরবরাহের
সুযোগ, পোনার আকার ও খাদ্য সরবরাহের সুযোগেরে উপর মজুদ ঘনত্ব নির্ভর
করে। সাধারণত ১৫ গ্রাম ওজনের ২৫০-৩০০ টি মনোসেক্স তেলাপিয়া পোনা প্রতি শতকে
মজুদ করা হয়। মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে প্রতি শতকে টি মনোসেক্স তেলাপিয়া মজুদ করা
হয়।
গ. পোনা পরিবহন
অক্সিজেন ব্যাগে পোনা পরিবহন করতে হবে। পোনা পরিবহনের সময় খেয়াল রাখতে হবে
যেন কোন ভাবে মাছের পোনা আঘাত প্রাপ্ত না হয়।
ঘ. পোনা অভ্যস্তকরণ ও মজুদ
পোনা পরিবহনের পাত্র কমপক্ষে ১৫-২০ মিনিট পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে রাখতে হবে।
এরপর আস্তে আস্তে পাত্র ও পুকুরের পানি অদল বদল করে পানির তাপমাত্রা সমতায়
আনতে হবে এবং পাত্র ও পুকুরের পানির তাপমাত্রা সমান হলে পাত্রের মুখ কাত করে
ধরে পাত্রের ভেতরের দিকে অল্প স্রোতের সৃষ্টি করতে হবে। এই অবস্থায় সুস্থ ও
সবল পোনা স্রোতের বিপরীতে অর্থাৎ পুকুরে চলে যাবে।
আরও পড়ুনঃ মধু কিভাবে খেলে বেশি উপকার পাবেন
মজুদ পরবর্তী খাদ্য ব্যবস্থাপনা
সাধারণভাবে আমরা জানি মাছচাষে মোট বিনিয়োগের ৬০-৭০ ভাগ বিনিয়োগ করা হয় মাছের
খাদ্য সরবরাহ করতে। এক্ষেত্রে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে মাছের খাদ্য তৈরী
করা হলে চাষির মাছের খাদ্য বাবদ খরচ কম হবে। চাষির আর্থিক অবস্হা এবং উপকরণের
সহজ লভ্যতা বিবেচনায় নিয়ে মৎস্যখাদ্য প্রস্তুত করা উত্তম । মাছের খাদ্য
হিসেবে স্থানীয় যে সকল উপকরণের ব্যবহার করা যায়--
- উদ্ভিজ উপাদানঃ চাউলের কুড়া, গমের ভুষি, চালের খুদ, আটা, ভূট্টা চূর্ণ, চিটা গুড়, সরিষার খৈল, তিলের খৈল, ক্ষুদিপানা, সয়াবিন ইত্যাদি
- প্রাণিজ উপাদানঃ ফিসমিল , চিংড়ির গুড়া, শামুকের মাংস, গবাদি পশুর রক্ত, পশুর নাড়িভুড়ি, মিট এন্ড বোন মিল ইত্যাদি।
মাছের বয়স ও প্রজাতির উপর পুষ্টির চাহিদা নির্ভরশীল। সাধারণত তেলাপিয়া মাছের
নার্সারী পুকুরে ৩০-২৮% এবং মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে ২৫% প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য
ব্যবহার করা হয়। সাধারণত তেলাপিয়ার পুকুরে ভাসমান খাদ্য ছিটিয়ে প্রয়োগ
করা হয়। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিন খাদ্য দেয়া উচিত।
সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগে বিবেচ্য বিষয়
- প্রতিদিন একই স্হানে এবং একই সময়ে খাদ্য দিতে হবে
- একবারে বেশি পরিমান খাদ্য প্রদান হতে বিরত থাকতে হবে
- বৃষ্টি/মেঘলাদিনে ও পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের আধিক্য থাকলে খাদ্য প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে
- খাদ্য প্রয়োগের পর পর্যবেক্ষণ করতে হবে খাবার অপচয় হচ্ছে কি না
মজুদ পরবর্তী সার প্রয়োগ
পুকুরের পানির রং এবং খাদ্য পরীক্ষার পর সার প্রয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে
হবে। সার প্রয়োগের প্রয়োজন হলে ১৫ দিন অন্তর অন্তর শতাংশ প্রতি
১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৫০ গ্রাম টিএসপি প্রয়োগ করতে হবে।
তেলাপিয়া মাছের স্বাস্থ্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
তেলাপিয়া মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্য মাছের তুলনায় বেশী। তবুও উচ্চ মজুদ
ঘনত্ব ও অতিরিক্ত খাদ্য প্রয়োগ এবং মাছের বর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্য পচে
পানি দূষিত হলে রোগের প্রকোপ দেখা যায়। তাই প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর প্রতি
শতাংশে ২৫০ গ্রাম লবন ও ১৫০ গ্রাম চুন/জিওলাইট প্রয়োগ করে পুকুরের পানির
গুনাগুন ভাল রাখতে হবে। অতিরিক্ত খাবার ও সার প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে
হবে।
মনোসেক্স তেলাপিয়া আহরণ ও উৎপাদন
মাছ আহরণের ৪ দিন পূর্ব হতে পুকুরে খাবার প্রয়োগের পরিমান কমিয়ে দিতে হবে এবং
৪৮ ঘন্টা পূর্ব হতে খাদ্য প্রয়োগ বন্ধ করে দিতে হবে। সাধারণত ৪-৬ মাসে
তেলাপিয়া মাছের গড় ওজন ৩৫০-৫০০ গ্রাম হবে। এসময় মাছের বাজার দর ভাল থাকলে জাল
টেনে আংশিক অথবা পুকুর শুকিয়ে সব মাছ ধরতে হবে। আধানিবিড় পদ্ধতিতে ৪-৬ মাসে
এক একর পুকুরে প্রায় ৫-৬ টন মাছ উৎপাদন করা সম্ভব।
আরও পড়ুনঃ
৫০ হাজার টাকায় ২৫ টি ব্যবসার আইডিয়া
মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতিতে আয়-ব্যয়ের হিসাব
০১ একর (১০০ শতক) একটি পুকুর হতে ৪-৬ মাসে সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব
সম্ভাব্য ব্যয়ঃ
| খরচের খাত | খরচ (আনুমানিক) টাকা |
|---|---|
| পুকুর প্রস্তুতি (ইজারা মূল্য, পুকুর সংস্কার, আগাছা পরিষ্কার, রাক্ষুসী ও অবঞ্চিত মাছ আপসারণ, চুন ও সার প্রয়োগ) | ৮০০০০.০০ |
| পোনা ক্রয় ৩০০০০ টি | ১২০০০০.০০ |
| খাদ্য বাবদ প্রায় ৮০০০ কেজি | ৪০০০০০.০০ |
| অন্যান্য | ৩০০০০.০০ |
| শ্রমিক, জাল টানা, পরিবহন ইত্যাদি | ৫০০০০.০০ |
| মোট | ৬৮০০০০.০০ |
সম্ভাব্য আয়ঃ
| আয়ের খাত | আয় (আনুমানিক) টাকা |
|---|---|
| তেলাপিয়া মাছ বিক্রি করে আয় (৫০০০ কেজি মাছ প্রতি কেজি ১৫০ টাকা হারে) | ৭৫০০০০.০০ |
| অন্যান্য মাছ বিক্রি করে আয় (মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে কার্প জাতীয় মাছ) | ২০০০০০.০০ |
| মোট | ৯৫০০০০.০০ |
| মোট লাভ (৯৫০০০০.০০- ৬৮০০০০.০০) | ২৭০০০০.০০ |
মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ পদ্ধতিতে সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: মনোসেক্স তেলাপিয়া আসলে কী এবং এটি সাধারণ তেলাপিয়ার চেয়ে আলাদা
কেন?
উত্তর: মনোসেক্স তেলাপিয়া হলো বিশেষ হরমোন (Methyltestosterone) চিকিৎসার
মাধ্যমে উৎপাদিত শুধু পুরুষ লিঙ্গের তেলাপিয়া মাছ।
প্রশ্ন ২: ১ বিঘা পুকুরে কতটি মনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা মজুত করা উচিত?
উত্তর: আধানিবিড় (Semi-intensive) চাষ পদ্ধতিতে প্রতি শতাংশে ২৫০ থেকে ৩০০ টি
পোনা মজুত করা আদর্শ। সেই হিসাবে ১ বিঘা বা ৩৩ শতাংশ পুকুরে মোট ৮,২৫০ থেকে
৯,৯০০টি পোনা মজুত করা যাবে।
প্রশ্ন ৩: মনোসেক্স তেলাপিয়া কত দিনে বিক্রির উপযোগী হয় এবং গড় ওজন কত হয়?
উত্তর: সঠিক নিয়মে সুষম খাদ্য এবং পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে পোনা
ছাড়ার মাত্র ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে এই মাছ বাজারজাতকরণের উপযোগী হয়ে ওঠে। এই
সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রতিটি মাছের গড় ওজন প্রায় ৩৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে
থাকে, যা বাজারে বিক্রির জন্য আদর্শ সাইজ।
প্রশ্ন ৪: এই মাছ চাষে উৎপাদন খরচ কমানোর প্রধান উপায় কী?
উত্তর: মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের মোট খরচের প্রায় ৬০-৭০% ব্যয় হয় কেনা
খাবারের পেছনে। এই খরচ কমাতে চাষিরা চালের কুঁড়া, গমের ভুসি, সরিষার খৈল এবং
ফিশ মিল মিশিয়ে বাড়িতেই কম খরচে মানসম্মত সম্পূরক খাদ্য তৈরি করতে পারেন।
এছাড়াও পুকুরের পাড়ে সবজি চাষ বা কার্প জাতীয় মাছের সাথে মিশ্র চাষ করলে
উৎপাদন খরচ অনেক কমে আসে।
প্রশ্ন ৫: পুকুরের পানি অতিরিক্ত সবুজ হয়ে গেলে করণীয় কী?
উত্তর: পুকুরের পানি অতিরিক্ত গাঢ় সবুজ হওয়ার অর্থ হলো পানিতে প্রাকৃতিক
খাবার বা ফাইটোপ্লাঙ্কটনের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেছে, যা রাতে অক্সিজেনের
মারাত্মক ঘাটতি তৈরি করতে পারে। এই সমস্যা সমাধানে সাময়িকভাবে পুকুরে সার এবং
সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। প্রয়োজনে পুকুরে নতুন পরিষ্কার পানি
যোগ করতে হবে অথবা প্রতি শতাংশে ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম চুন প্রয়োগ করতে হবে।
লেখকের নিজস্ব মতামত: মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বাজার বিশ্লেষণের আলোকে আমি মনে করি, বাংলাদেশের মৎস্য
চাষে মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি এক যুগান্তকারী ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য
মাধ্যম। সঠিক নিয়মে পুকুর প্রস্তুত করে মানসম্মত পোনা নির্বাচন এবং সুষম
খাদ্যের সঠিক অনুপাত বজায় রাখলে এই চাষে লোকসানের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
অল্প পুঁজি ও মাত্র ৪-৬ মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে এমন উচ্চ ফলনশীল ও লাভজনক
প্রজেক্ট বর্তমান সময়ে বেকারত্ব দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শতভাগ
বাণিজ্যিক সফলতা পেতে হলে চাষিদের অবশ্যই অতিরিক্ত খাবার অপচয় রোধ করতে হবে এবং
পানির গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সঠিক খামার ব্যবস্থাপনাই এই চাষে
কম খরচে ভাগ্য বদলের আসল চাবিকাঠি।



অনুগ্রহ করে Smartclicker24-এর নীতিমালা অনুযায়ী মন্তব্য করুন। সকল মন্তব্য পর্যালোচনা করা হয়
comment url