বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা খরচ

বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা খরচ বর্তমানে অনেকের  একটি আগ্রহের বিষয়। সাধারণত বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসার খরচ আনুমানিক ২.৫ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা বা এর কাছাকাছি হয়ে থাকে। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং চিকিৎসা পদ্ধতির উপর নির্ভর করে এই খরচ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। একবার ব্যর্থ হলে একাধিক সাইকেল প্রয়োজন হলে  মোট খরচ আরও বৃদ্ধি পায়। আইভিএফ চিকিৎসার সাথে ওষুধ, পরীক্ষা, ফলোআপ খরচও যুক্ত হয়। 
বাংলাদেশে এখন আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ চিকিৎসকদের মাধ্যমে এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা সহ বড় শহরগুলোতে উন্নতমানের ফার্টিলিটি সেন্টার রয়েছে। এই চিকিৎসা বন্ধ্যাত্ব সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত। তবে চিকিৎসা শুরু করার আগে সঠিক তথ্য ও বাজেট পরিকল্পনা করা জরুরি। সম্পূর্ণ জানতে আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়ুন।

পেইজ সূচীপত্রঃ বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা খরচ 

বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা খরচ কেন বেশি হয়

বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা খরচ কেন বেশি প্রয়োজন হয় তা জানার জন্য প্রথমে জানতে হবে আইভিএফ বা IVF কি? আইভিএফ(In Vitro Fertilization) হলো একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শরীরের বাইরে ল্যবরেটরিতে পুরুষ দেহ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করে স্ত্রী দেহ থেকে সংগৃহীত ডিম্বাণুর মিলন ঘটিয়ে কৃত্তিমভাবে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। এরপর সেই ভ্রূণ স্ত্রী দেহের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। এই পদ্ধতি সাধারণত তাদের জন্য ব্যবহৃত হয় যারা প্রাকৃতিকভাবে সন্তান ধারণে ব্যর্থ হচ্ছেন।

বর্তমান সময়ে বন্ধ্যাত্ব একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীদের হরমোনজনিত সমস্যা, পুরুষদের শুক্রাণুর দুর্বলতা, কিংবা উভয়ের শারীরিক জটিলতার কারণে অনেক দম্পতি প্রাকৃতিকভাবে দৈহিক মিলনের মাধ্যমে সন্তান নিতে পারেন না। এই ক্ষেত্রে আইভিএফ (IVF) চিকিৎসা একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে আইভিএফ (IVF) বা টেস্টিউব চিকিৎসা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে যার ফলে ভুমিস্ট শিশু টেস্টিউব বেবী নামে পরিচিত। বিশ্বের প্রথম টেস্টিউব বেবী লুইস ব্রাউন জম্ম ১৯৭৮ এ ২৫ জুলাই ইউকে তে। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ চিকিৎসকদের কারণে এখন বাংলাদেশের মধ্যেই এই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে , এর আগে অনেকেই বিদেশে গিয়ে করাতেন।

বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশে বর্তমানে বেশ কয়েকটি উন্নত মানের হাসপাতাল ও ইনফার্টিলিটি সেন্টারে আইভিএফ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর  ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও বসুন্ধরার এভারকেয়ার  হাসপাতাল, চট্টগ্রাম এ চট্টগ্রামের  ইনোভা,  সিলেটের শ্রীমঙ্গলে দীপশিখা ছাড়াও খুলনাতে ভিক্টরী ফার্টিলিটি এন্ড আইভিএফ সেন্টার ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন কিছু উন্নত ক্লিনিক রয়েছে যেখানে এই সেবা পাওয়া যায়। অবস্থানভেদে এর খরচ ভিন্ন হয়ে থাকে। 

গত কয়েক বছরে চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নতির ফলে আইভিএফ সাফল্যের হারও বেড়েছে। বিশেষ করে উন্নত ল্যাব, অভিজ্ঞ এমব্রায়োলজিস্ট এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে এখন রোগীরা ভালো ফলাফল পাচ্ছেন। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং ক্লিনিকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী নারীর বয়স একটি বড় ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে।
নারীর বয়স সফলতার হার %
৩০ বছর এর নীচে প্রায় ৪০% থেকে ৫০%
৩০ থেকে ৩৫ বছর প্রায় ৩৫% থেকে ৪০%
৩৫ থেকে ৪০ বছর প্রায় ২৫% থেকে ৩০%
৪০ বছরের বেশি প্রায় ১০% থেকে ২০% এর মধ্যে
তবে এখনও বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা সকলের নাগালের মধ্যে আসেনি। কারণ খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় অনেকেই আর্থিক কারণে পিছিয়ে পড়েন। তবুও সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে এই চিকিৎসার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসার খরচ কেমন

বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা খরচ সাধারণত ২,৫০,০০০(দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার)  টাকা থেকে ৫,০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ) টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। তবে এটি নির্ভর করে ক্লিনিক, চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তির উপর।প্রথমবারে সফল না হলে একাধিক সাইকেল করার প্রয়োজন হয় যার ফলে মোট খরচ আরও বেড়ে যায়। 

এছাড়াও ওষুধ, টেস্ট, ফলোআপ ভিজিট এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় অনেক সময় অনুমানের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। তাই চিকিৎসা শুরুর আগে একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট পরিকল্পনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ আইভিএফ প্রক্রিয়া শেষ করতে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।

আইভিএফ খরচ নির্ধারণে যেসব বিষয় প্রভাব ফেলে

আইভিএফ চিকিৎসার খরচ নির্ভর করে বিভিন্ন বিষয়ের উপর। যেমন রোগীর বয়স কেমন , শারীরিক অবস্থা , এবং পূর্বের চিকিৎসার ইতিহাস। বয়স বেশি হলে সফলতার হার কম হয়, ফলে অতিরিক্ত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

ক্লিনিকের মান এবং প্রযুক্তির ধরনও খরচের উপর বড় প্রভাব ফেলে। উন্নত ল্যাব এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে খরচ কিছুটা বেশি হয়, তবে এখেত্রে সাফল্যের সম্ভাবনাও বেশি হয়।

এছাড়া বিশেষ কিছু প্রক্রিয়া যেমন ICSI (Intracytoplasmic Sperm Injection), ডোনার ডিম্বাণু ব্যবহার, বা ভ্রূণ ফ্রিজিং ইত্যাদি করার প্রয়োজন হলে খরচ আরও বৃদ্ধি পায়। তাই প্রতিটি ধাপের খরচ এর পরিমান আগে থেকেই জেনে নেওয়া উচিত।

সংক্ষেপে আইভিএফ চিকিৎসার ধাপসমূহ

আইভিএফ চিকিৎসা সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে নারীর ডিম্বাণু উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়া প্রায় বেশ কিছুদিন এমন কি কয়েক মাস পর্যন্ত হতে পারে, এরপর নির্দিষ্ট সময়ে ডিমের কোয়ালিটি বুঝে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। 
পরবর্তী ধাপে ল্যাবে উক্ত ডিম্বাণুকে পুরুষ দেহ থেকে সংগৃহীত শুক্রাণুর সাথে বিশেষ সিরিন্জের মাধ্যমে  মিলন ঘটিয়ে ভ্রূণ(Embryo) তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করা হয় এবং কয়েকদিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। 

শেষ ধাপে কয়েকটি ভ্রুণ থেকে একটি বা দুইটি  সুস্থ ভ্রূণ নির্বাচন করে তা বিশেষ প্রক্রিয়ায়  নারী দেহের  জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখা হয় গর্ভধারণ হয়েছে কিনা। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সময়সাপেক্ষ।

আইভিএফ চিকিৎসার সুবিধা ও ঝুঁকি সমূহ

আইভিএফ(IVF) চিকিৎসা বন্ধ্যাত্ব সমস্যার একটি আধুনিক ও কার্যকর সমাধান হিসেবে পরিচিত।অনেক দম্পতি এই পদ্ধতির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সন্তান না হওয়ার সমস্যার সমাধান পেয়ে থাকেন ফলে সফলভাবে সন্তান লাভ করছেন। বিশেষ করে যাদের ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক, হরমোন সমস্যা বা পুরুষের শুক্রাণুর সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী।
আইভিএফ(IVF) চিকিৎসা পদ্ধতিতে ভ্রূণ নির্বাচন করা যায়, ফলে সুস্থ সবল সন্তান জন্মের সম্ভাবনা বাড়ে। এছাড়া দেরিতে বিয়ে করা বা বয়স বেশি হলেও সন্তান নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করে দেয় এই চিকিৎসা।

তবে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসায় কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। যেমন হরমোন ইনজেকশনের কারণে শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, যেমন মাথা ব্যথা বা ওজন বৃদ্ধি। কখনো কখনো একাধিক ভ্রূণ স্থাপনের ফলে যমজ বা একাধিক সন্তান হওয়ার ঝুঁকি থাকে, এবং ব্যর্থতার সম্ভাবনা। এছাড়া মানসিক চাপও একটি বড় বিষয়। বারবার চেষ্টা করেও সফল না হলে হতাশা তৈরি হতে পারে।

আইভিএফ চিকিৎসা নেওয়ার আগে যা করণীয়

আইভিএফ চিকিৎসা নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পুরো প্রক্রিয়া, খরচ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা খুব জরুরি। আর্থিক পরিকল্পনাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল, তাই আগে থেকেই বাজেট তৈরি করা এবং প্রয়োজনে সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করে রাখা উচিত।

তাই আইভিএফ চিকিৎসা নেওয়ার আগে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং ঝুঁকি ও সুবিধা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিকল্পনা ও চিকিৎসার মাধ্যমে সফলতার সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।

সবশেষে আইভিএফ চিকিৎসার পূর্বে মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। আইভিএফ একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, তাই ধৈর্য এবং ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নিজস্ব মতামতঃ বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা খরচ

বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা খরচ এখনও অনেকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চিকিৎসায় অনকে আগ্রহী হলেও প্রচুর খরচ হয় সেই তুলনায় এর সফলতার হার অনেক কম, তবে সঠিক তথ্য, পরিকল্পনা এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে এই চিকিৎসা সফলভাবে গ্রহণ করা সম্ভব।
 
তবে বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মানের সেবা পাওয়া যাচ্ছে, যা এই চিকিৎসার একটি ইতিবাচক দিক। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা খরচ কম হবে এবং এই চিকিৎসা ব্যবস্থা সবার জন্য সহজলভ্য হবে এটাই প্রত্যাশা।



এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

Please comment according to Smartclicker24 policies. All comments are subject to review.

comment url