সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা
সরিষার তেলের উপকারিতা ও স্বাস্থ্যগত গুণাগুণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথে
ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যা রান্নার স্বাদ ও সুগন্ধ বাড়ানোর পাশাপাশি শারীরিক
নানা জটিলতা দূর করতে এক অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে কাজ করে।
যেকোনো ভেষজ উপাদানের মতোই এর অতিরিক্ত ব্যবহারের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে, তাই
দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার জন্য এই তেলের ভালো ও মন্দ উভয় দিক সম্পর্কে সম্যক ধারণা
থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিস্তারিত জানতে পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
এইচ সূচিপত্রঃসরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা
- সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা
- রান্নায় সরিষার তেলের ব্যবহার ও উপকারিতা
- ত্বকে সরিষার তেল ব্যবহারর উপকারিতা
- চুলে সরিষার তেল ব্যবহার এর উপকারিতা ও নিয়ম
- সরিষার ও সয়াবিন তেলের মধ্যে কোনটি ভালো
- হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সরিষার তেল
- ব্যথানাশক হিসেবে সরিষার তেলের ব্যবহার
- ঠান্ডা ও কাশি নিরাময়ে সরিষা তেলের ভূমিকা
- খাঁটি সরিষার তেল চেনার উপায়
- সরিষার তেলের ক্ষতিকর দিক
- সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে মনে আসা কিছু প্রশ্নোত্তর(FAQ)
- লেখকের মতামতঃ সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা
সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা
সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং
জীবনযাত্রার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। খাঁটি ঘানি ভাঙা
সরিষার তেলে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় এটি হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে
সাহায্য করে এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। এছাড়া এর তীব্র ঝাঁঝালো
গন্ধযুক্ত এই তেল ঠান্ডা-কাশি নিরাময়ে, বাতের ব্যথা উপশমে এবং হজমশক্তি বৃদ্ধি
করতে খুবই কার্যকরী। ত্বক ও চুলের যত্নেও এই প্রাকৃতিক উপাদানটি যুগ যুগ ধরে লোশন
এর মত ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যা শরীরের ত্বককে করে স্বাস্থ্যবান এবং ভিতরের গঠনকে
মজবুত করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
তবে অতিরিক্ত কোনো কিছুই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়, তাই এই তেলের অতিমাত্রায়
ব্যবহারে কিছু নেতিবাচক দিক বা অপকারিতাও পরিলক্ষিত হতে পারে। এতে থাকা
উচ্চমাত্রার ইউরুসিক অ্যাসিড বেশি পরিমাণে শরীরে প্রবেশ করলে তা হৃদপিণ্ডের জন্য
কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সতর্ক করে থাকে। আবার
তৈলাক্ত ত্বকে অতিরিক্ত এই তেল মালিশ করলে লোমের গোড়ায় থাকা লোমকূপ বন্ধ হয়ে
অ্যালার্জি, র্যাশ কিংবা তীব্র চুলকানির মতো চর্মরোগ হতে পরে। তাই দীর্ঘমেয়াদী
সুস্থতা নিশ্চিত করতে এবং ভেজালের ভিড়ে আসল পুষ্টিগুণ উপভোগ করতে হলে, সঠিক
নিয়মে পরিমিত পরিমাণে খাঁটি তেল ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
রান্নায় সরিষার তেলের ব্যবহার ও উপকারিতা
বাাঙালিদের ঐতিহ্যবাহী ও মুখরোচক রান্নায় খাঁটি সরিষার তেলের ব্যবহার কেবল
খাবারের স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং এটি স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ কার্যকরী। এই
তেলে রান্না করলে খাবারের পুষ্টিগুণ দীর্ঘক্ষণ ভালো থাকে এবং এটি আমাদের
পরিপাকতন্ত্রকে ভালো রাখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। বিশেষ করে বিভিন্ন পদের
ভর্তা, ঝালমুড়ি কিংবা জিভে জল আনা আচার তৈরিতে এই ঝাঁঝালো তেল ছাড়া যেন বাঙালি
সংস্কৃতি জমে ওঠে না। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সঠিক পরিমাপে এই তেল ব্যবহার করলে
তা আমাদের মেটাবলিজম রেট বাড়াতে এবং শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুনঃ কালোজিরা ফুলের মধুর চেনার উপায়
রান্নার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হলো এই তেল উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না বা ডিপ ফ্রাই
করলেও এর পুষ্টিগুণ সহজে নষ্ট হয় না। গভীরভাবে ভাজা বা পোড়ানোর জন্য এটি অত্যন্ত
নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর একটি মাধ্যম। এই তেলে থাকা স্বাস্থ্যকর মনোস্যাচুরেটেড
ফ্যাট আমাদের রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা দ্রুত কমাতে সাহায্য করে এবং
ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়। ফলে প্রতিদিনের খাবারে এটি ব্যবহার করলে
হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়।
ত্বকে সরিষার তেল ব্যবহারর উপকারিতা
ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে এবং প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার হিসেবে খাঁটি সরিষার তেল
ব্যবহার করার প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। বিশেষ করে শীতকালে শুষ্ক ও খসখসে
ত্বকে এই তেল দিয়ে মালিশ করলে ত্বক অত্যন্ত কোমল, মসৃণ ও সজীব হয়। এতে থাকা
প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ই এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের মরা চামড়া দূর
করতে এবং বয়সের ছাপ বা বলিরেখা প্রতিরোধে সাহায্য করে। প্রাকৃতিকভাবে উজ্জ্বল ও
সতেজ ত্বক পেতে চাইলে রাসায়নিকযুক্ত ক্রিমের পরিবর্তে এই তেল ব্যবহার করা একটি
ভালা উপায় হতে পারে।
ত্বকের যেকোনো ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ রোধ করতে এই
তেলের অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান ভূমিকা পালন করে থাকে। হালকা কুসুম গরম করে
এই তেল নিয়মিত ত্বকে মালিশ করলে দেহের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং ত্বকের ভেতরের
কোষগুলোকে দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করে তোলে। অনেকেই সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি
বা ইউভি রে থেকে ত্বককে রক্ষা করতে এটিকে সানস্ক্রিন হিসেবেও ব্যবহার করে থাকেন।
তবে যাদের ত্বক খুব বেশি তৈলাক্ত, তাদের ক্ষেত্রে মুখে সরাসরি ব্যবহারের আগে
অবশ্যই কিছুটা সচেতন হওয়া উচিত।
চুলে সরিষার তেল ব্যবহার এর উপকারিতা ও নিয়ম
চুল পেকে যাওয়া রোধ করতে এবং চুলকে গোড়া থেকে মজমুত করতে সরিষার তেলের
কার্যকারিতা অতুলনীয়। এই তেলে থাকা আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফ্যাটি
অ্যাসিড চুলের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে চুলকে করে তোলে ঘন ও কালো। নিয়মিত চুলে এবং
মাথার ত্বকে এই তেল ম্যাসাজ করলে স্ক্যাল্পের রক্ত সঞ্চালন বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং
নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। শুষ্ক ও রুক্ষ চুলে প্রাণ ফিরিয়ে এনে প্রাকৃতিক
কন্ডিশনার হিসেবে কাজ করে, যার ফলে চুল পড়া বন্ধ হয়।
মাথার ত্বকের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো খুশকি এবং বিভিন্ন ধরনের চর্বিযুক্ত ময়লা,
যা দূর করতে এই তেলের ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড সাহায্য করে। এতে থাকা আলফা ফ্যাটি
অ্যাসিড চুলের আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং চুলকে সহজে ভেঙে যাওয়া বা ফেটে যাওয়া থেকে
পুরোপুরি রক্ষা করে। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন এই তেল হালকা গরম করে চুলে লাগালে
চুলের উজ্জ্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। কেমিক্যালযুক্ত দামি হেয়ার প্রোডাক্টের পেছনে
টাকা খরচ না করে নিয়মিত এই তেল ব্যবহারে চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
চুলে সরিষার তেল মাখার পর যদি ভালোভাবে শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলা না হয়, তবে বাইরে
বের হলে বাতাসে থাকা ধুলোবালি সহজেই চুলে আটকে যায়। এই জমে থাকা ময়লা থেকে মাথার
ত্বকে তীব্র চুলকানি, ব্রন বা ফলিকুলাইটিসের মতো চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। অনেকের
ক্ষেত্রে এই তেলের তীব্র ঝাঁঝালো উপাদানের কারণে মাথার ত্বকে অ্যালার্জির সৃষ্টি
হতে পারে এবং খুশকির পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই চুলে এই তেল ব্যবহারের
ক্ষেত্রে রাতে ব্যবহার করে সকালে ঘুম থেকে উঠে শ্যাম্পু দিয়ে মাথা পরিষ্কার করে
ধুয়ে ফেলতে হয়।
সরিষার ও সয়াবিন তেলের মধ্যে কোনটি ভালো
খাদ্যতালিকায় কোন তেলটি সেরা এই নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই সরিষার তেল ভালো
নাকি সয়াবিন, এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খায়। পুষ্টিগুণ এবং স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা
করলে সয়াবিন তেলের তুলনায় খাঁটি সরিষার তেলকে অনেক বেশি উপকারী ও নিরাপদ মনে করা
হয়। সয়াবিন তেল সাধারণত রিফাইনিং বা পরিশোধনের বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য
দিয়ে যায়, যার ফলে এর প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে, ঘানি
ভাঙা সরিষার তেল কোনো কৃত্রিম প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি পাওয়া যায় বলে এর ঔষধি
গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে।
ফ্যাটি অ্যাসিড গঠনের দিক থেকেও সয়াবিন তেলের চেয়ে সরিষার তেল আমাদের
পরিপাকতন্ত্রের জন্য অনেক বেশি উপকারী। সয়াবিন তেলে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের
পরিমাণ বেশি থাকে, যা অতিরিক্ত তাপে অক্সিডাইজড হয়ে শরীরের কোষের ক্ষতি করতে
পারে, যা সরিষার তেলের ক্ষেত্রে হয় না। এছাড়া সরিষার তেল গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা
কমাতে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। তাই দীর্ঘমেয়াদী
সুস্থতা ধরে রাখতে সয়াবিন তেলের চেয়ে সরিষার তেল ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সরিষার তেল
হৃদযন্ত্র বা হার্টকে সুস্থ ও সচল রাখতে প্রতিদিনের রান্নায় সঠিক ফ্যাট বা তেল
জাতীয় খাবার নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। খাঁটি সরিষার তেলে
থাকা Monounsaturated এবং Polyunsaturated ফ্যাট রক্তে থাকা ক্ষতিকর এলডিএল
কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এটি ধমনীতে প্লাক বা চর্বি
জমতে বাধা দেয়, যার ফলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা
নিয়ন্ত্রণে আসে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে এই তেল গ্রহণ করলে তা স্ট্রোক এবং হার্ট
অ্যাটাকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আমাদের জীবন রক্ষা পেতে পারে।
আরও পড়ুনঃ কিভাবে মধু খেলে বেশি উপকার পাবেন
এই তেলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমিয়ে
হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে পারে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন
গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা নিয়মিত এই তেল রান্নায় ব্যবহার করেন, তাদের হৃদরোগে
আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। তবে বাজার থেকে তেল কেনার সময় সেটি
কেমিক্যালমুক্ত ও খাঁটি কি’না তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ব্যথানাশক হিসেবে সরিষার তেলের ব্যবহার
শরীরের যেকোনো জয়েন্টের ব্যথা,বাতের ব্যথা কিংবা পেশীর টান দূর করতে সরিষার তেলের
ম্যাসাজ একটি প্রাচীন ও পরীক্ষিত ঘরোয়া চিকিৎসা। এই তেলে রয়েছে অ্যালিল
আইসোথিওসায়ানেট নামক একটি উপাদান, যা শরীরের কোন অংশের ফোলা এবং ব্যথা উপশমে ভালো
কাজ করে। শীতকালে বয়স্ক মানুষদের হাঁটু বা কোমরের ব্যথা যখন বেড়ে যায়, তখন এই তেল
হালকা গরম করে মালিশ করলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। এটি অক্রান্ত স্থানে রক্ত
সঞ্চালনক সচল করে পেশীর জড়তা দূর করতে এবং হাড়ের জোড়গুলোকে নমনীয় রাখতে সাহায্য
করে।
যেকোনো চোট বা আঘাতজনিত কারণে শরীরের কোনো স্থান ফুলে গেলে সেখানে কালো জিরে বা
রসুন দিয়ে হালকা গরম করা সরিষার তেল লাগালে ফোলা ভাব দ্রুত কমে যায়। কায়িক
পরিশ্রমের পর শরীরে ক্লান্তি ও ব্যথা অনুভূত হলে এই তেল পুরো শরীরে মালিশ করলে
আরামদায়ক ঘুম হয়। তবে মালিশ করার সময় খুব বেশি জোরে চাপ না দিয়ে হালকা হাতে
ম্যাসাজ করা উচিত।
ঠান্ডা ও কাশি নিরাময়ে সরিষা তেলের ভূমিকা
শীতকালে বা ঋতু পরিবর্তনের সময়ে কাশি ও সর্দি হলে এবং সর্দির কারনে নাক বন্ধ হওয়া
সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সরিষার তেল অনেকটা ওষুধের মতো কাজ করে। ফুটন্ত গরম
পানিতে কয়েক ফোঁটা এই তেল এবং সামান্য কালো জিরে দিয়ে সেই ভাপ বা স্টিম নাক দিয়ে
টেনে নিলে বন্ধ নাক নিমেষেই খুলে যায়। এছাড়া হালকা গরম তেলের সাথে সামান্য কর্পূর
মিশিয়ে বুকে ও পিঠে মালিশ করলে ফুসফুসের জমাট বাঁধা কফ সহজেই নরম হয়ে বের হয়ে
আসে। নবজাতক শিশুদের বুকে ও পায়ের তলায় এই তেল মালিশ করার ঐতিহ্য আমাদের দেশে যুগ
যুগ ধরে চলে আসছে।
এই তেলের ঝাঁঝালো গন্ধ শ্বাসযন্ত্রের ভেতরে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন দূর করতে এবং
শ্বাসনালী পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। সাইনাসের তীব্র ব্যথায় ভুগছেন এমন রোগীদের
জন্য এই তেলের ভাপ নেওয়া অত্যন্ত আরামদায়ক একটি থেরাপি হিসেবে কাজ করে। এটি
শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখে এবং ঠান্ডা লাগার কারণে তীব্র মাথাব্যথা দ্রুত
দূর করতে সাহায্য করে।
খাঁটি সরিষার তেল চেনার উপায়
বাজারে বর্তমানে খাঁটি তেলের নামে নানা রকমের ভেজাল এবং কেমিক্যাল যুক্ত ভেজাল
সরিষার তেল বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
খাঁটি সরিষার তেল চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো এর তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ, যা বোতলের
মুখ খুললেই নাকে এসে লাগে এবং চোখে পানি চলে আসে। খাঁটি তেলের রঙ সাধারণত গাঢ়
সোনালী বা সামান্য লালচে হয়ে থাকে এবং এটি বেশ ঘন প্রকৃতির হয়। ভেজাল তেলের রঙ
সাধারণত হালকা হলুদ হয় এবং এতে ঝাঁঝালো গন্ধ কম পাওয়া যায়।
বড়িতে এই তেল পরীক্ষা করার জন্য সামান্য তেল ফ্রিজে কিছুক্ষণ রেখে দিলে যদি নিচে
সাদা চর্বির স্তর জমে, তবে বুঝতে হবে এতে ভেজাল আছে। খাঁটি তেল কখনো ফ্রিজের
সাধারণ তাপমাত্রায় জমে যায় না বা এর রঙের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। এছাড়া হাতের
তালুতে সামান্য তেল নিয়ে ঘষলে যদি কোনো কৃত্রিম রঙ বা কেমিক্যালের গন্ধ বের হয়,
তবে তবে বুঝবেন ভেজাল, ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
সরিষার তেলের ক্ষতিকর দিক
যেকোন জিনিস নির্দিষ্ট পরিমানের বেশি ব্যবহার করলে তা শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ
হতে পারে। সরিষার তেলের অন্যতম একটি প্রধান নেতিবাচক দিক হলো এতে থাকা উচ্চ
মাত্রার ইউরুসিক অ্যাসিড, যা হৃদপিণ্ডের পেশীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত
পরিমাণে এই অ্যাসিড শরীরে প্রবেশ করলে তা অ্যানিমিয়া বা হৃদরোগের জটিলতা বাড়তে
পারে বলে কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। তাই স্বাস্থ্যকর হলেও এই তেল রান্নায়
ব্যবহারের সময় পরিমাণের দিকে অবশ্যই কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখা উচিত।
ত্বকে বা চুলে অতিরিক্ত পরিমাণে এই তেল ব্যবহার করলে অনেকের ক্ষেত্রে অ্যালার্জিক
রিঅ্যাকশন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে নবজাতক শিশুদের কোমল ত্বকে সরাসরি এই তেল
অতিরিক্ত মালিশ করলে ত্বক কালো হয়ে যেতে পারে বা ত্বকের পোরস বন্ধ হয়ে ইনফেকশন
হতে পারে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই তেলের অতিরিক্ত ব্যবহার বা সেবন হরমোনের
ভারসাম্যে ব্যাহত হতে পারে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করে থাকেন। সরিষার তেলে থাকা
ইরিউসিক এসিড নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের কিছু
অঞ্চলে সরিষার তেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত বা সীমাবদ্ধ; তবে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
নয়। সুত্র:
https://www.chefsresource.com/is-mustard-oil-banned-in-europe
সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে মনে আসা কিছু প্রশ্নোত্তর(FAQ)
১. প্রতিদিন রান্নায় সরিষার তেল খাওয়া কি নিরাপদ?
উত্তর: হ্যাঁ, প্রতিদিনের রান্নায় পরিমিত পরিমাণে খাঁটি সরিষার তেল খাওয়া
সম্পূর্ণ নিরাপদ। এতে থাকা স্বাস্থ্যকর মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে ভালো
কোলেস্টেরল বাড়াতে এবং হার্ট সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
২. চুলে সরিষার তেল দিলে কি কোনো ক্ষতি হতে পারে?
উত্তর: অতিরিক্ত বা ভুল ব্যবহারে কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। এই তেল বেশ ভারী হওয়ায়
মাথার ত্বকের লোমকূপ বন্ধ করে দিতে পারে, যা ভালোভাবে শ্যাম্পু না করলে চুলকানি
বা চুল পড়ার কারণ হতে পারে।
৩. সরিষার তেল কি সরাসরি ত্বকে ব্যবহার করা যায়?
উত্তর: শুষ্ক ও স্বাভাবিক ত্বকের জন্য এটি ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে। তবে
যাদের ত্বক অতিরিক্ত তৈলাক্ত বা সংবেদনশীল, তাদের মুখে সরাসরি ব্যবহারের ক্ষেত্রে
সতর্ক থাকা উচিত।
৪. বাজারে ভেজাল সরিষার তেল চেনার উপায় কী?
উত্তর: খাঁটি তেলের রঙ গাঢ় সোনালী ও ঘন হয় এবং এর বোতলের মুখ খুললেই একটি ঝাঁঝালো
গন্ধ নাকে লাগে। ভেজাল বা কেমিক্যালযুক্ত তেল সাধারণত হালকা রঙের হয় এবং এতে কোনো
ঝাঁঝ থাকে না।
৫. সয়াবিন নাকি সরিষার তেলের মধ্যে কোনটি স্বাস্থ্যের জন্য সেরা?
উত্তর: পুষ্টিগুণের দিক থেকে সয়াবিন তেলের চেয়ে খাঁটি সরিষার তেল অনেক বেশি সেরা
ও নিরাপদ। সয়াবিন তেল রিফাইনিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, আর সরিষার তেল
প্রাকৃতিকভাবেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
লেখকের মতামতঃ সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের সুস্থ জীবনযাপনে সরিষার তেলের উপকারিতা এবং এর পুষ্টিগুণ
সত্যি অতুলনীয়। তবে বাজারে সস্তা ও ভেজাল তেলের ভিড়ে আসল উপাদানটি চিনে নেওয়া এবং
তা পরিমিত মাত্রায় ব্যবহার করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। অতিরিক্ত ব্যবহারে যেকোনো
ভালো জিনিসেরই কিছু অপকারিতা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা সরিষার
তেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ইউরিসিক এসিডের পরিমাণ বেশি থাকায় কানাডা আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু দেশগুলোতে এর
ব্যবহার কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও এশিয়া দেশগুলোর তথা বাংলাদেশ ভারত সহ
পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশে দীর্ঘদিন যাবত ঐতিহ্যের সাথে এই তেলের ব্যবহার হয়ে
আসছে। তাই বাজারে প্রচলিত সয়াবিনের পরিবর্তে এই তেলের ব্যবহার অনেক বেশি
স্বাস্থ্যসম্মত বলে আমি মনে করি।



অনুগ্রহ করে Smartclicker24-এর নীতিমালা অনুযায়ী মন্তব্য করুন। সকল মন্তব্য পর্যালোচনা করা হয়
comment url