কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতা

কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতা সম্পর্কে  আমাদের সবারই কমবেশি জানা আছে। কালো ধুতরা একটি বহুল পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ যার বৈজ্ঞানিক নাম Datura metel এবং এটি সোলানেসি (Solanaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ইহা গ্রামবাংলার বাড়ির আঙিনা এর আশেপাশের জঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে। আমরা সাদা ধুতরা সম্পর্কে অনেকে কমবেশি জানলেও কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের যে অনেক উপকারিতা রয়েছে তা আমাদের অনেকেরই অজানা রয়ে গেছে।
কালো ধুতরা গাছের পাতা, ফুল, ফল থেকে নানা রকমের ভেষজ ওষুধ তৈরি হয়ে থাকলেও এর শিকড়ে রয়েছে এমন সব উপাদান যা প্রাচীনকাল থেকে মানুষের বিভিন্ন রোগ ব্যাধির আয়ুর্বেদিক ও  ইউনানী চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই আর্টিকেলে আমরা কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতা ঐতিহ্য ব্যবহার ও সতর্কতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সূচিপত্রঃ কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতা

কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতার বর্ণনা

কালো ধুতরার শিকড়ের উপকারিতা জানতে হলে এর সঠিক ব্যবহার ও সতর্কতা সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল প্রয়োগ মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। লোকজ চিকিৎসায় কালো ধুতরার শিকড়কে ব্যথা উপশমে ব্যবহার করা হতো। গ্রামের কবিরাজরা কালো ধুতরার শিকড় শুকিয়ে গুঁড়ো করে পাউডার হিসেবে সংরক্ষণ করা হতো পরবর্তীতে সে পাউডারকে বাহ্যিকভাবে লাগানোর পরামর্শ দিতেন। আর এভাবে এটি হাড়ের ব্যথা বা পেশির অস্বস্তিতে ব্যবহৃত হতো।

কিছু কিছু অঞ্চলে সর্দি-কাশি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ধুতরা গাছের শিকড়ের ধোঁয়া বা রস ব্যবহার করা হতো বলে শোনা যায়। তাছাড়া ঘুমের মধ্যে অনেকের মুখ দিয়ে লালা পরে এবং এই লালা দিয়ে বালিশ ভিজে যায় এই সমস্যার সমাধানেও অনেকে কালো ধুতরা গাছের শিকড় ব্যবহারের কথা বলে থাকেন। তবে এসব পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তেমন একটা নেই এবং না বুঝে, জেনে ও শুনে ব্যবহার করলে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

আয়ুর্বেদীক ও ইউনানী চিকিৎসায় কালো ধুতরা গাছের শিকড়কে স্নায়ুবিক প্রশান্তির জন্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঐতিহ্যগত ব্যবহার মানেই এটি নিরাপদ এমন ধারণা অনেকটাই ভুল। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরামর্শে ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত।

কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের রাসায়নিক উপাদান ও কার্যকারিতা

কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের রাসায়নিক উপাদান ও কার্যকারিতা নিয়ে ভেষজ জগতে দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ রয়েছে। এই গাছের শিকড়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড জাতীয় উপাদান পাওয়া যায়। এর মধ্যে অ্যাট্রোপিন, স্কোপোলামিন ও হাইসোসিয়ামিন উল্লেখযোগ্য বলে জানা যায়। এসব রাসায়নিক উপাদান স্নায়ুতন্ত্রের উপর মারাত্বক প্রভাব ফেলতে সক্ষম।। এই উপাদানগুলো স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলে এবং ব্যথা উপশমে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
কালো ধুতরার শিকড়ে থাকা উপাদান শরীরে দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত ব্যবহারে মাথা ঘোরা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া ও বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে। এজন্য প্রাচীন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এটি ব্যথা ও খিঁচুনি নিরাময়ে বেশ ব্যবহৃত হতো। কিছু কিছু অঞ্চলে এখনো ব্যবহৃত হয়ে থাকে

তবে এই উপাদানগুলোর শক্তিশালী প্রভাবের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। সঠিক মাত্রা না মানলে বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ব্যথা উপশমে কালো ধুতরার শিকড়ের ভূমিকা

কালো ধুতরা গাছের শিকড় প্রাকৃতিক ব্যাথা নাশক হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে কোমর ব্যথা কিংবা হাঁটুর হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা, আর্থ্রাইটিস এবং মাংসপেশির ব্যথা কমাতে ও এটি বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় শিকড় বেটে পেস্ট তৈরি করে আক্রান্ত স্থানে বাহ্যিক প্রলেপ হিসেবে এটি ব্যবহার করে প্রয়োগ করা হয়। এতে দ্রুত ব্যথা কমে এবং আরাম পাওয়া যায় বলে অনেকের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

গ্রাম অঞ্চলে অনেক সময় বিচ্ছু জাতীয় কিছু পোকামাকড় এ্রর কামড়ের ফলে আক্রান্ত স্থানে প্রচন্ড ব্যথা হয় এই সমস্ত ক্ষতস্থানে কালো ধুতরা গাছের শিকড় বেটে রস করে লাগালে ব্যথা উপশম হয় বলে অতি প্রাচীনকাল থেকেই এমন ধারণা চলে আসছে।

কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতার কথা ভেবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত ব্যবহার করা উচিত। কারণ অতিরিক্ত প্রয়োগের ফলে ত্বকে অ্যালার্জি হতে পারে।

মনুষিক প্রশান্তি ও ঘুমের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণা

অনেক পুরোনো ভেষজ বইয়ে কালো ধুতরাকে মনুষিক প্রশান্তিকারী উদ্ভিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের রস কিছু অঞ্চলে অনিদ্রা বা অস্থিরতার সমস্যায় খাওয়া হয়। কালো ধুতরার উপাদানগুলো মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে কাজ করে এবং নার্ভ সিগন্যাল কমিয়ে শরীরকে শিথিল করে বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে।

কালো ধুতরার শিকড়ের রস পান করার ফলে ঘুমের সমস্যা বা মানসিক অস্থিরতা কিছুটা কমতে পারে তবে এর রাসায়নিক উপাদান শরীরের স্নায়ুতন্ত্রে তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে এবং অতিরিক্ত ব্যবহার করলে পাগলামি ভাব, ঘোর লাগা, বিভ্রম এমনকি হৃদস্পন্দন বেড়ে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ঘুমের সমস্যা থাকলে অভিজ্ঞ কবিরাজের পরামর্শ ছাড়া ধুতরার মতো বিষাক্ত গাছের শিকড় ব্যবহার না করে ঘুমের অভ্যাস ঠিক করা, মানসিক চাপ কমানো এবং ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ত্বকের সমস্যায় কালো ধুতরা গাছের শিকড়

গ্রামীন এলাকায় একদিকে যেমন পোকামাকড়ের কামড়ের ফলে ফোলা কমাতে শিকড়ের পেস্ট ব্যবহার করে থাকেন তেমনি শরীরের ফোড়া, চুলকানি বা ত্বকের উপরে এই জাতীয় সমস্যায় ক্ষতস্থানে কালো ধুতরা গাছের শিকড় বেটে রস করে সেই রস ক্ষতস্থানে লাগালে জীবাণু নাশক হিসেবে কাজ করে এবং দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। এর অ্যান্টিসেপ্টিক গুণ ত্বককে জীবাণু থেকে রক্ষা করতে পারে বলে প্রাচীন ধারণা রয়েছে।

কালো ধুতরার শিকড়ে এমন কিছু প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে যা ত্বক পরিষ্কার রাখতে ও টাক সমস্যা সমাধানে সহায়ক বলে অনেকে ধারণা করেন। উক্ত উপাদান ত্বকের প্রদাহ কমাতেও সহায়ক হতে পারে বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে।

এক্ষেত্রে কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতা থাকলেও এতে ত্বকের জ্বালা, অ্যালার্জি বা জ্বালা পোড়া এমন ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ত্বকের সমস্যা হলে বর্তমানে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কারণ কালো ধুতরার মতো ভেষজ এর ভুল ব্যবহার সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।

শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার

শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানি সমস্যায় কালো ধুতরা গাছের শিকড় প্রাচীনকাল থেকে ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহার হয়ে আসছে। এই গাছের শিকড়ে থাকা কিছু শক্তিশালী অ্যালকালয়েড শ্বাসনালীর পেশী শিথিল করতে সহায়তা করে। বিশেষ করে হাঁপানির কারণে যখন শ্বাসনালী সংকুচিত হয়ে যায়, তখন কালো ধুতরার ‍শিকরের রস ব্যবহার করে তা প্রশমনের চেষ্টা করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে শিকড় শুকিয়ে গুড়া করে প্রস্তুত করে ব্যবহার করলে কাশি ও শ্বাসকষ্ট কমতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

ছাড়া এটি শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় বুকের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তবে কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতাগুলো মূলত প্রাচীন চিকিৎসা জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে, আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কালো ধুতরা একটি বিষাক্ত উদ্ভিদ এবং এর শিকড়ে থাকা উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানির ক্ষেত্রে এটি কখনোই নিজে নিজে ব্যবহার করা উচিত নয়।

কালো ধুতরার শিকড়ের ঐতিহ্যগত ব্যবহার ও ধারনা

কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতা সম্পর্কে বিভিন্ন পুস্তক ও লোকমুখে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা যায় যে অতি প্রাচীনকাল থেকেই কালো ধুতরা গাছের শিকড় বিভিন্ন ধরনের কালো জাদু অলৌকিক চিন্তাভাবনা থেকে মানুষ ব্যবহার করে আসছে অনেকে মনে করেন যে কালো দুধটা গাছের শিকড় তাবিজ করে কোমরে বেঁধে রাখলে নানা ধরনের অশুভ শক্তি থেকে রেহাই পাওয়া যায় বলে অনেকে মনে করেন।
প্রাচীনকাল থেকে অনেকে ধারনা করেন যে, এই কালো ধুতরা গাছ বাড়িতে থাকলে নানা ধরনের ভূত-পেত ও এদের অশুভ ছায়া থেকে বাড়ি সুরক্ষিত থাকে ও নানা ধরনের দুঃস্বপ্ন থেকে রেহাই পাওয়া যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই গাছ খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাদের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থতেও এই গাছের উল্লেখ রয়েছে মর্মে অনেকে বর্ণনা করে থাকেন।

কালো ধুতরার শিকড়ের এই সমস্ত উপকারীতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ একেবারে না থাকলেও এগুলো হচ্ছে এক ধরনের বিশ্বাস, যা যুগ যুগ ধরে মানুষ অন্তরে ধারণ এবং পালন করে আসছেন।

নিজস্ব মতামতঃ কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতা

কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের উপকারিতা থাকলেও আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এটি গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কালো ধুতরা গাছের শিকড় ব্যবহার করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সতর্কতা। কারন, প্রাচীনকালে এর ব্যাবহার অনেক বেশি থাকলেও বর্তমানে এই গাছ কিছুটা বিষাক্ত উদ্ভিদ হিসাবে পরিচিত, তাই ভুলভাবে ব্যবহার করলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

যদি কেউ এই কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের ভেষজ চিকিৎসা নিতে চান, তবে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে কালো ধুতরা গাছের শিকড়ের ব্যবহার কমে গেছে, কারণ এর ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষ এখন বেশি সচেতন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

Please comment according to Smartclicker24 policies. All comments are subject to review.

comment url